নকশি কাঁথা
কাপড় স্তরে স্তরে সাজিয়ে সুই-সুতায় নকশা তোলা কাঁথা। জামালপুরে মজুরিসহ খরচ ৳১,৬০০–১,৮০০, ঢাকার পাইকারকে বিক্রি ৳২,০০০, আর ঢাকার দোকানে সেটাই ৳৪,০০০–৫,০০০।
- শেষ পর্যালোচনা: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- সংস্করণ ১
- শুরুর পুঁজি
- ৳২০,০০০ – ৳২,০০,০০০ সম্পাদকীয় অনুমান
- জনবল
- ১ – ২৫ জন
- প্রথম বিক্রি
- ৩০ – ৩৬৫ দিন বিতর্কিত
- খরচ উঠবে
- ১৫ – ৫০ মাস সম্পাদকীয় অনুমান
- কাজের ধরন
- ঘরে বসে · সহজ
ব্যবসাটি কী
পুরোনো শাড়ি বা সুতির কাপড় স্তরে স্তরে সাজিয়ে সুই-সুতায় নকশা তুলে কাঁথা বানানো। জামালপুর এই কাজের কেন্দ্র — জেলার সব উপজেলাতেই হয়, আর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জামালপুরের নকশিকাঁথা’ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। জেলার সব উপজেলা মিলিয়ে প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান, দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা, প্রায় ২০০টি দোকান আর প্রায় দুই লাখ নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কাজের ধরনটা সোজা। উদ্যোক্তা কাপড় আর সুতা কিনে গ্রামের নারীদের হাতে দেন, তাঁরা নিজেদের বাড়িতে বসে সংসারের কাজের ফাঁকে সেলাই করে নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দেন। একেকটা প্রমাণ মাপের কাঁথায় পাঁচ থেকে সাতটা শাড়ি লাগে, আর সেলাই করতে এক থেকে দেড় মাস — কারও কারও এক বছরও লেগে যায়। টাকার হিসাবটাই আসল কথা। জামালপুরের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের হিসাবে একটি নকশি কাঁথা তৈরিতে মজুরিসহ খরচ পড়ে ৳১,৬০০ থেকে ৳১,৮০০, আর ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করতে হয় ৳২,০০০ টাকায়। সেই একই কাঁথা ঢাকার বড় বিপণিবিতানে বিক্রি হয় ৳৪,০০০ থেকে ৳৫,০০০ টাকায়। অর্থাৎ যে হাত মাসখানেক ধরে সেলাই করল আর যে উদ্যোক্তা কাপড় কিনে দিল, তাঁদের দুজনের ভাগে পড়ে দামের অর্ধেকেরও কম। পুঁজির অভাবে উদ্যোক্তারা নিজেরা ঢাকায় বাজারজাত করতে পারেন না — এই একটি কারণেই লাভের বড় অংশ জেলার বাইরে চলে যায়।
আয়-ব্যয়ের হিসাব
| বিষয় | পরিসর | সূত্র | সংশোধন দিন |
|---|---|---|---|
| মাসিক চলতি মূলধন | ৳১,৫০০ – ৳৪৫,০০০ | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| বিক্রয় মূল্য | ৳২,০০০ / একক | বাজারদর | |
| পরিবর্তনশীল খরচ | ৳১,৬০০ – ৳১,৮০০ / একক | বাজারদর | |
| মোট লাভের হার | ১০% – ২০% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| প্রথম বিক্রি পর্যন্ত সময় | ৩০ – ৩৬৫ দিন | বিতর্কিত | |
| খরচ উঠে আসার সময় | ১৫ – ৫০ মাস | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| নগদ চক্র | ৪৫ – ১০৫ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| অপচয় ও ক্ষতির হার | ৩% – ৮% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা | ০ – ০.৮ | সম্পাদকীয় অনুমান |
শুরু করতে যা লাগবে
- সুই, কাঁচি, ট্রেসিং পেপার ও নকশার ছক। বড় প্রতিষ্ঠানে এমব্রয়ডারি মেশিনও থাকে, তবে হাতের কাজই জামালপুরের পরিচয়।যন্ত্রপাতি
- কাপড় ও সুতা। একটি প্রমাণ মাপের কাঁথায় ৫–৭টি শাড়ি লাগে। আগে পুরোনো কাপড়ের পাড় থেকে সুতা তুলে কাজ হতো, এখন তাঁতিদের কাছ থেকে নীল, লাল, হলুদ সুতা কিনে আনা হয়।প্রাথমিক মাল
- ট্রেড লাইসেন্স — পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন। ফরম ৳১০, লাইসেন্স বই ৳৫০, আদর্শ কর ৳৩০, স্ট্যাম্প ৳১৫০–৩০০, লাইসেন্স ফি ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ৳১০০–৬০,০০০, সঙ্গে ভ্যাট ও সাইনবোর্ড ফি। ৩–৫ কার্যদিবসে হয়।লাইসেন্স
- ভরাট নকশা তোলার হাত — এটাই জামালপুরের বিশেষত্ব। নকশা আঁকা, সমান সেলাই আর রঙ মেলানো শিখতে সময় লাগে, আর শেখার জায়গা মূলত পরিবার ও দলনেতার কাছে।দক্ষতা
- প্রতিটি এলাকায় একজন দলনেতা, যিনি কাপড় বিলি করেন আর তৈরি মাল ফেরত আনেন। জামালপুর সদর, মেলান্দহ ও নান্দিনার একজন ব্যবসায়ীর ১০ জনের কমিটির প্রতিটি সদস্য আড়াই থেকে তিন হাজার নারীকে কাজ দেন।সরবরাহকারী
- আলাদা কারখানা লাগে না — কর্মীরা নিজেদের বাড়িতে বসেই কাজ করেন। জামালপুরের বেশির ভাগ দোকানই উদ্যোক্তার বাড়ির সামনের অংশে করা শোরুম।কাজের জায়গা
কাজের ধাপ
- 1ঠিক করুন আপনি কোন জায়গায় দাঁড়াবেন — নিজে সেলাই করবেন, নাকি কাপড়-সুতা কিনে দল বানিয়ে কাজ করাবেন। জামালপুরে দুটোই চলে, আর আয়ের হিসাব দুই রকম।
- 2জামালপুর শহরের বকুলতলা, মাদ্রাসা রোড, কলেজ রোড ও আজম চত্বরের শোরুমগুলো ঘুরে দেখুন কোন নকশা আর কোন পণ্য এখন চলছে। নকশা বাজারের সঙ্গে বদলায় — এখন মানুষ ও প্রাণীর নকশা কমে ফুল, লতাপাতা ও আলপনা বেশি চলছে।
- 3কাপড় আর সুতা কিনুন। একটি প্রমাণ মাপের কাঁথায় পাঁচ থেকে সাতটি শাড়ি লাগে; আজকাল পুরোনো কাপড়ের বদলে নতুন সুতির কাপড় বেশি ব্যবহার হচ্ছে।
- 4ট্রেসিং পেপারে নকশা এঁকে কাপড়ে তুলে নিন, তারপর সেই আঁকা বরাবর সেলাই। আগে কাঠের ব্লক ব্যবহার হতো, এখন ট্রেসিং পেপার।
- 5প্রতিটি এলাকায় একজন দলনেতা ঠিক করুন যিনি কাপড় বিলি করবেন ও তৈরি মাল ফেরত আনবেন। এই ব্যবস্থাতেই নারীরা নিজেদের বাড়িতে বসে কাজ করতে পারেন।
- 6মজুরি কাঁথাপ্রতি ঠিক করে লিখে রাখুন এবং কর্মীকেও জানিয়ে দিন। কত দিনে ফেরত দিতে হবে সেটাও আগেই বলে দিন।
- 7শুধু কাঁথা নয় — বেডশিট, কুশন কাভার, ওয়াল ম্যাট, পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, ফতুয়া, চাদর, বালিশের কাভার, ব্যাগ ও পার্সেও একই নকশা তুলুন। ছোট পণ্য পাঁচ-সাত দিনে শেষ হয়, তাই টাকা দ্রুত ঘোরে।
- 8বৈশাখ, ঈদ আর শীতের আগে উৎপাদন বাড়ান। বৈশাখের আগে দেশের নানা জায়গা থেকে ক্রেতারা জামালপুরে আসেন।
- 9ঢাকার পাইকারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করুন এবং সম্ভব হলে নিজে ঢাকায় গিয়ে বিক্রি করুন। পুঁজির অভাবে নিজে বাজারজাত করতে না পারাটাই জামালপুরের উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
- 10কর্মীদের চোখের যত্নের ব্যবস্থা রাখুন — দিনের আলোয় কাজ, বিরতি, আর দরকারে চশমা। কম আলোয় দীর্ঘক্ষণ সেলাই করে জামালপুরের অনেক নারী চোখের সমস্যায় পড়েছেন, আর চোখ গেলে কর্মীও যায়।
মৌসুম
- জানুবেশি
- ফেব্রুস্বাভাবিক
- মার্চবেশি
- এপ্রিবেশি
- মেস্বাভাবিক
- জুনস্বাভাবিক
- জুলাকম
- আগকম
- সেপ্টেস্বাভাবিক
- অক্টোস্বাভাবিক
- নভেবেশি
- ডিসেবেশি
কোন জেলায় ভালো
- খুব উপযোগীঢাকা · উৎপাদনের নয়, বিক্রির জায়গা। জামালপুরের কাঁথা ঢাকার ছোট-বড় পাইকারি ও খুচরা বাজারে যায়, আর বড় বিপণিবিতানে ৳৪,০০০–৫,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। যে উদ্যোক্তা নিজে ঢাকায় বিক্রি করতে পারেন, তাঁর মার্জিন কয়েক গুণ বেশি।
- খুব উপযোগীজামালপুর · দেশের কেন্দ্র। জেলার সব উপজেলাতেই নকশিকাঁথা হয়, সবচেয়ে বেশি সদর, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জে এবং নান্দিনা, নরুন্দি, ভাটারা ও বেলটিয়া এলাকায়। প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান, ২০০-র মতো দোকান, দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা। এসএমই ফাউন্ডেশন এখানে নকশিকাঁথা ক্লাস্টার করেছে, আর জেলা প্রশাসন নকশিকাঁথা দিয়েই জেলার ব্র্যান্ডিং করেছে।
- সম্ভবময়মনসিংহ · পাশের বিভাগীয় শহর। বৈশাখ ও ঈদে ময়মনসিংহ থেকে ক্রেতারা জামালপুরে এসে কেনেন, আর জামালপুরের পণ্য ময়মনসিংহের দোকানেও যায়।
- কম উপযোগীনেত্রকোণা · ময়মনসিংহ বিভাগের ভেতরে এবং সুই-সুতার কাজের চল আছে, তবে জামালপুরের মতো সংগঠিত ক্রেতা-বিক্রেতার জাল এখানে নেই।
- কম উপযোগীশেরপুর · জামালপুরের বকশীগঞ্জ-দেওয়ানগঞ্জ বলয়ের লাগোয়া, তাই কর্মী পাওয়া সহজ হতে পারে। তবে এখানে আলাদা কোনো নকশিকাঁথা ক্লাস্টার বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়নি — যুক্তিটি শুধু নৈকট্যের।
- কম উপযোগীটাঙ্গাইল · তাঁত ও সুতার পুরোনো বাজার থাকায় কাঁচামাল সহজে মেলে। নকশিকাঁথার আলাদা ক্লাস্টারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঝুঁকি ও সাবধানতা
- বেশিনির্ভরশীলতা: বাজারটা আপনার হাতে নেই। পুঁজির অভাবে জামালপুরের উদ্যোক্তারা নিজেরা ঢাকায় মাল বেচতে পারেন না, তাই ঢাকার পাইকারের কাছে ৳২,০০০ টাকায় দিতে হয়। সেই কাঁথা ঢাকার বড় দোকানে ৳৪,০০০–৫,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। এক থেকে দেড় মাসের শ্রম আর ৳১,৬০০–১,৮০০ খরচের পর হাতে থাকে ৳২০০–৪০০। বিপণনের ব্যবস্থা না বদলালে এই ভাগটাও বদলাবে না।
- বেশিঅন্যান্য: কর্মীদের চোখ নষ্ট হওয়া। পারিশ্রমিক কম হওয়ায় অনেকে দিনে ১৪ ঘণ্টার বেশি সেলাই করেন, রাতে কম আলোতেও বসেন। জামালপুরে এমন নারী আছেন যাঁরা কয়েক বছরের মধ্যেই সুঁইয়ে সুতা পরানোর ক্ষমতা হারিয়েছেন এবং সেলাইয়ের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। চিকিৎসা আর চশমার খরচ জোগাতে না পারায় সমস্যা বাড়ে, আর দক্ষ কর্মী হারানো মানে উদ্যোক্তারও ক্ষতি।
- বেশিচলতি মূলধন: টাকা এক থেকে দেড় মাস আটকে থাকে, কখনো এক বছর। কাপড় ও সুতা আগে কিনতে হয়, মজুরিও দিতে হয়, অথচ কাঁথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এক টাকাও ফেরত আসে না। একসঙ্গে দশ-বারোটা কাঁথা চালু থাকলে ১৬–২২ হাজার টাকা কাপড়-সুতা-মজুরিতে বাঁধা পড়ে থাকে।
- মাঝারিচাহিদা: বিক্রি বছরজুড়ে সমান নয়। বৈশাখ, ঈদ আর শীতের আগে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন মাঝারি উদ্যোক্তারা চাহিদা সামলাতে হিমশিম খান। বাকি সময় মাল পড়ে থাকে, অথচ কর্মীদের কাজ দিয়ে রাখতে হয়।
- মাঝারিঅন্যান্য: কাঁচামালের দাম। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জামালপুরের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন কাপড় ও সুতার দাম বাড়ায় পণ্যের দামও কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। খরচ বাড়লেও ঢাকার পাইকারি দর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে না, আর তখন ১০ শতাংশের মার্জিনটাই মুছে যায়।
সূত্র
সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির ধাপ সমূহ
সংগ্রহ: ১৬ সেপ, ২০২৬সমর্থন করে: শুরুর পুঁজি · বাংলাদেশ
কী বদলেছে
এখনো কোনো সংশোধন প্রকাশ হয়নি।
প্রশ্নোত্তর
এখনো কেউ প্রশ্ন করেননি। প্রথম প্রশ্নটি আপনার হোক।
মিল আছে এমন ব্যবসা
মোমবাতি ও সাবান তৈরি
অল্প পুঁজিতে ছোট কারখানায় মোমবাতি ও সাবান তৈরি। সাবান বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক তালিকায় — সিএম লাইসেন্স ছাড়া বিক্রি করা যাবে না; মোমবাতি তালিকার বাইরে।
- পুঁজি
- ৳২০ হাজার – ৳৪ লাখ
- জনবল
- ১ – ১০ জন
- প্রথম আয়
- ১৯ – ৯৪ দিন
কাঠের খেলনা তৈরি
আসবাবের কারখানার ফেলে দেওয়া কাঠের টুকরা দিয়ে শিশুদের খেলনা বানানো। বিসিকের মেলায় কাঠের পণ্য ৳১০০ থেকে ৳৩,০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
- পুঁজি
- ৳২০ হাজার – ৳৩ লাখ
- জনবল
- ১ – ১০ জন
- প্রথম আয়
- ৩০ – ১২০ দিন
সাইকেল ও রিকশা মেরামত
রাস্তার পাশে ছোট দোকানে সাইকেল, রিকশা ও ই-রিকশা মেরামত। যন্ত্রপাতি ও মালের দাম মিলিয়ে ৳১৫,০০০ থেকেই শুরু করা যায়, আর খদ্দের কাজ শেষে নগদ টাকা দিয়ে যান।
- পুঁজি
- ৳১৫ হাজার – ৳১.২ লাখ
- জনবল
- ১ – ৩ জন
- প্রথম আয়
- ৭ – ৩০ দিন
কাগজের ঠোঙা ও প্যাকেজিং
বর্জ্য কাগজ কিনে হাতে ঠোঙা বানিয়ে দোকানে সরবরাহ। খাকি ঠোঙা কেজি ৳১৩৫–১৪০, সাদা ৳৮০; ৬০ কেজি কাগজে সাড়ে ৭ হাজার খরচে ৭০ কেজি ঠোঙা, লাভ ২,৩০০ টাকা।
- পুঁজি
- ৳১০ হাজার – ৳৬০ হাজার
- জনবল
- ১ – ২০ জন
- প্রথম আয়
- ৩ – ১৫ দিন
