রাজমিস্ত্রি ও ঠিকাদারি
গাঁথুনি, ঢালাই ও ফিনিশিংয়ের শ্রম চুক্তি। ঢাকায় প্লিন্থের প্রতি বর্গফুটে নির্মাণ খরচ ৳১৮০০–৩০০০, আর রাজমিস্ত্রির সরকারি ন্যূনতম হাজিরা শহরে ৳৯৪০।
- শেষ পর্যালোচনা: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- সংস্করণ ১
- শুরুর পুঁজি
- ৳৫০,০০০ – ৳৫,০০,০০০ সম্পাদকীয় অনুমান
- জনবল
- ৩ – ২৫ জন
- প্রথম বিক্রি
- ১৫ – ৬০ দিন সম্পাদকীয় অনুমান
- খরচ উঠবে
- ৩ – ৮ মাস সম্পাদকীয় অনুমান
- কাজের ধরন
- ঘুরে ঘুরে সেবা · মাঝারি কঠিন
ব্যবসাটি কী
রাজমিস্ত্রি ও ঠিকাদারি মানে নির্মাণকাজের শ্রমের দিকটা — গাঁথুনি, ঢালাই, প্লাস্টার আর ফিনিশিং। মালিক জমি আর নকশা দেন, মালামাল কে কিনবে সেটা চুক্তিতে ঠিক হয়, আর মিস্ত্রির দল কাজটা করে দেয়। দুই রকম চুক্তি চলে। এক, শুধু শ্রমের চুক্তি — প্রতি বর্গফুটে বা দিনের হাজিরায় টাকা। দুই, থোক বা মালামালসহ চুক্তি — তখন রড, সিমেন্ট, বালু, ইট সবই ঠিকাদারের ঘাড়ে। প্রথম আলোর ২৭ জুলাই ২০২৫ তারিখের হিসাব বলছে, ঢাকা ও আশপাশে অগভীর ভিতে প্লিন্থ এরিয়ার প্রতি বর্গফুটে নির্মাণ খরচ ৳১৮০০–২০০০, আর পাইল ফাউন্ডেশন লাগলে ৳২৫০০–৩০০০ — এই হিসাবে ভ্যাট, আয়কর আর ঠিকাদারের লাভ ধরা নেই। শ্রমের সরকারি ন্যূনতম হারও আছে। নির্মাণ ও কাঠশিল্পের মজুরি প্রজ্ঞাপনে শহরে রাজমিস্ত্রির দৈনিক মজুরি ৳৯৪০, গ্রামে ৳৮৭০, জোগালির ৳৬৮০ ও ৳৬২০, আর টাইলস-মোজাইক মিস্ত্রির ৳১১০৫ ও ৳১০২০। ওটা ২০২১ সালের হার, এখন বাজারে এর চেয়ে বেশি দিতে হয়। এই ব্যবসার আসল বিপদ টাকার। মালিক কিস্তিতে টাকা দেন, কিন্তু মিস্ত্রি-জোগালিকে সপ্তাহে হাজিরা দিতেই হয়। মাঝখানের এই ফাঁকটা নিজের পকেট থেকে ভরতে হয়। আর রডের দাম এক বছরে ৬০ গ্রেডে ১০ শতাংশ আর ৪০ গ্রেডে ১৭ শতাংশ বেড়েছে, তাই পুরোনো দরে থোক চুক্তি নিলে লাভের বদলে লোকসান হয়।
আয়-ব্যয়ের হিসাব
| বিষয় | পরিসর | সূত্র | সংশোধন দিন |
|---|---|---|---|
| মাসিক চলতি মূলধন | ৳১,৯০,০০০ – ৳৩,০০,০০০ | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| বিক্রয় মূল্য | ৳১,৮০০ – ৳৩,০০০ / একক | বাজারদর | |
| পরিবর্তনশীল খরচ | ৳১,৫৩০ – ৳২,৭৬০ / একক | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| মোট লাভের হার | ৮% – ১৫% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| প্রথম বিক্রি পর্যন্ত সময় | ১৫ – ৬০ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| খরচ উঠে আসার সময় | ৩ – ৮ মাস | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| নগদ চক্র | ৩০ – ৯০ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| অপচয় ও ক্ষতির হার | ৩% – ৮% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা | ৫ – ৩৫ | সম্পাদকীয় অনুমান |
শুরু করতে যা লাগবে
- কর্নি, ওলন, পানির লেভেল, মাপার ফিতা, ভাইব্রেটর, মিক্সার মেশিন, বাঁশ ও কাঠের শাটারিং, সেফটি বেল্ট ও হেলমেট। মিক্সার ও ভাইব্রেটর ভাড়াতেও নেওয়া যায়।যন্ত্রপাতি
- ট্রেড লাইসেন্স — সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা। ফরম ৳১০, লাইসেন্স বই ৳৫০, আদর্শ কর ৳৩০, স্ট্যাম্প ৳১৫০–৩০০, লাইসেন্স ফি ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ৳১০০–৬০,০০০, সঙ্গে ভ্যাট ও সাইনবোর্ড ফি। কাগজ ঠিক থাকলে ৩–৫ কার্যদিবস।লাইসেন্স
- টিআইএন ও ভ্যাট নিবন্ধন — জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বিল থেকে উৎসে কর ও ভ্যাট কাটা হয়, তাই কোম্পানি বা সরকারি কাজ ধরতে হলে এ দুটো লাগবেই।লাইসেন্স
- দল চালানো। নির্মাণ ও কাঠশিল্পের মজুরি কাঠামোয় ছয়টি গ্রেড আছে — জোগালি থেকে টাইলস-মোজাইক মিস্ত্রি পর্যন্ত। কোন কাজে কোন গ্রেডের লোক লাগবে তা জানা থাকলে খরচ ঠিক থাকে।দক্ষতা
- নকশা পড়া আর পরিমাণ হিসাব (এস্টিমেট) করা — কত ইট, কত সিমেন্ট, কত রড লাগবে তা আগেই বের করা। এই একটি দক্ষতাই থোক চুক্তিতে লাভ আর লোকসানের পার্থক্য করে দেয়।দক্ষতা
- রড, সিমেন্ট, বালু-পাথর ও ইটের আলাদা সরবরাহকারী। থোক চুক্তিতে এঁদের কাছ থেকে বাকিতে মাল পাওয়ার সম্পর্কই মূলধনের কাজ করে।সরবরাহকারী
- নিজের বসার জায়গা লাগে না, কাজ হয় সাইটে। তবে যন্ত্রপাতি ও শাটারিং রাখার একটা গুদাম বা টিনশেড দরকার।কাজের জায়গা
কাজের ধাপ
- 1আগে ঠিক করুন আপনি কী বেচবেন — শুধু শ্রম, না মালামালসহ থোক কাজ। দুটোর ঝুঁকি একেবারে আলাদা।
- 2নিজের দল গড়ুন। কমপক্ষে একজন হেড মিস্ত্রি, কয়েকজন রাজমিস্ত্রি আর জোগালি। কে কোন গ্রেডের, তা মজুরি ঠিক করার সময় কাজে লাগে।
- 3সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিন, আর সরকারি কাজ ধরতে চাইলে ঠিকাদারি তালিকাভুক্তির শর্ত জেনে নিন।
- 4কাজ ধরার আগে নকশা দেখে পরিমাণ হিসাব করুন — কত ইট, কত বস্তা সিমেন্ট, কত টন রড, কত সিএফটি বালু। এই হিসাব ভুল হলে থোক চুক্তিতে সব লাভ চলে যায়।
- 5আজকের বাজারদর ধরে দর দিন, গত মাসের দরে নয়। রড ও সিমেন্টের দর প্রতি সপ্তাহে বদলায়।
- 6চুক্তিপত্র লিখে নিন: মোট টাকা, কিস্তির সময়, কোন ধাপে কত টাকা, মালামাল কে দেবে, আর দেরি হলে কী হবে।
- 7কাজ শুরুর আগে অগ্রিম নিন। অগ্রিম ছাড়া কাজে নামলে প্রথম সপ্তাহের হাজিরা নিজের পকেট থেকে যাবে।
- 8রড, সিমেন্ট, বালু ও ইটের জন্য আলাদা আলাদা সরবরাহকারী ঠিক করুন আর বাকিতে মাল দেওয়ার শর্ত আগেই আলোচনা করুন।
- 9প্রতিদিনের হাজিরা খাতায় লিখে রাখুন। কে কত দিন এল, কত টাকা পেল — এটাই মাস শেষে বিরোধ ঠেকায়।
- 10প্রতিটি ধাপ শেষ হলে মালিককে দেখিয়ে কিস্তির টাকা বুঝে নিন। এক ধাপের টাকা না পেয়ে পরের ধাপে যাবেন না।
- 11বর্ষার তিন-চার মাসের জন্য আগে থেকে ভাবুন — তখন ঢালাই ও প্লাস্টারের কাজ কমে যায় আর দল ধরে রাখা কঠিন হয়।
মৌসুম
- জানুবেশি
- ফেব্রুবেশি
- মার্চবেশি
- এপ্রিবেশি
- মেস্বাভাবিক
- জুনকম
- জুলাকম
- আগকম
- সেপ্টেকম
- অক্টোস্বাভাবিক
- নভেবেশি
- ডিসেবেশি
কোন জেলায় ভালো
- খুব উপযোগীচট্টগ্রাম · বন্দরনগরীতে আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবনের কাজ নিয়মিত; পাহাড়ি ঢালে ভিত ও রিটেইনিং ওয়ালের আলাদা কাজ থাকে।
- খুব উপযোগীঢাকা · দেশের সবচেয়ে বড় নির্মাণ বাজার, ডেভেলপার কোম্পানি ও ব্যক্তিগত বাড়ি দুটোই বেশি; মজুরিও এখানে সবচেয়ে বেশি।
- খুব উপযোগীগাজীপুর · কারখানা, শ্রমিক আবাসন ও গুদামের কাজ বারো মাস চলে।
- খুব উপযোগীনারায়ণগঞ্জ · ঢাকার লাগোয়া শিল্পাঞ্চল, ছোট ডেভেলপার ও কারখানার সম্প্রসারণের কাজ বেশি।
- খুব উপযোগীসিলেট · প্রবাসী পরিবারের বাড়ি তৈরির কাজ সবচেয়ে বেশি এই জেলায়; টাকা তুলনামূলক সময়মতো আসে।
- সম্ভববগুড়া · উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যকেন্দ্র; ডেভেলপার কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে।
- সম্ভবকক্সবাজার · হোটেল-রিসোর্টের কাজ বেশি, তবে মৌসুমি — পর্যটন মৌসুমের আগে কাজ শেষ করার চাপ থাকে।
- সম্ভবকুমিল্লা · প্রবাসী আয়ে বাড়ি তৈরি বেশি, আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষে বাণিজ্যিক ভবনের কাজ।
- সম্ভবখুলনা · শহর ও শিল্প এলাকার কাজ; লবণাক্ত এলাকায় ভিত ও ঢালাইয়ে আলাদা সতর্কতা লাগে।
- সম্ভবরাজশাহী · শহর বাড়ছে, বহুতল ভবনের কাজ বাড়ছে; মজুরি ঢাকার চেয়ে কম।
ঝুঁকি ও সাবধানতা
- বেশিবাকিতে বিক্রি: মালিক কিস্তিতে টাকা দেন, প্রায়ই ধাপ শেষ হওয়ার পরে। কিন্তু মিস্ত্রি-জোগালিকে সপ্তাহে হাজিরা দিতেই হয়, নইলে দল অন্য সাইটে চলে যায়। ১২ জনের একটা দলের এক সপ্তাহের মজুরিই ৳৫০,০০০–৬০,০০০, আর সেই টাকা ঠিকাদারকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। এক কিস্তি আটকে গেলে পরের সপ্তাহেই কাজ বন্ধ।
- বেশিচলতি মূলধন: থোক চুক্তিতে রড, সিমেন্ট, বালু ও ইট ঠিকাদারকে কিনতে হয়। ৬০ গ্রেডের এমএস রড ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ মেট্রিক টন ৳৯২,৫০০–৯৪,৫০০, যা এক বছরে ১০ শতাংশ বেড়েছে; ৪০ গ্রেড ৳৮৯,০০০–৯১,০০০, বেড়েছে ১৭ শতাংশ। এক ছাদের রডেই কয়েক লাখ টাকা লেগে যায়, আর সেই টাকা বিলের আগেই ঢালতে হয়।
- মাঝারিনির্ভরশীলতা: থোক চুক্তিতে দর দেওয়ার পর মালামালের দাম বাড়লে সেই ক্ষতি পুরোটাই ঠিকাদারের। প্রথম আলোর ২৮ জুন ২০২৬ তারিখের বাজারদরে ৬০ গ্রেডের রড ছিল টনপ্রতি ৳৮৮,০০০–৯২,০০০, আর সেপ্টেম্বরে সেটাই ৳৯২,৫০০–৯৪,৫০০। তিন মাসেই টনপ্রতি কয়েক হাজার টাকার তফাত — বড় কাজে এটাই পুরো লাভ খেয়ে ফেলে। চুক্তিতে দাম বাড়ার শর্ত না লিখলে টাকাটা আর ফেরত আসে না।
- মাঝারিচাহিদা: বর্ষার তিন-চার মাস ঢালাই ও প্লাস্টারের কাজ কমে যায়, আর ঈদের আগে-পরে শ্রমিক গ্রামে চলে যান। এই সময়ে কাজ না থাকলেও হেড মিস্ত্রিকে ধরে রাখতে অগ্রিম দিতে হয়, নইলে পরের মৌসুমে দল আর পাওয়া যায় না।
- মাঝারিঅন্যান্য: নির্মাণসাইটে দুর্ঘটনা ঘটে — উঁচু থেকে পড়া, দেয়াল বা শাটারিং ধসে যাওয়া, বৈদ্যুতিক শক। কেউ মারা গেলে বা পঙ্গু হলে চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের ভার ঠিকাদারের ঘাড়েই আসে, আর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। হেলমেট-সেফটি বেল্টের খরচ এর তুলনায় সামান্য।
সূত্র
সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির ধাপ সমূহ
সংগ্রহ: ১৬ সেপ, ২০২৬সমর্থন করে: শুরুর পুঁজি · বাংলাদেশ
- সংগ্রহ: ১৫ সেপ, ২০২৬
সমর্থন করে: শুরুর পুঁজি · ঢাকা মহানগর — সিপাহীবাগ, মিরপুর-৬, মোহাম্মদপুর টাউন হল, নিউমার্কেট, রামপুরা, মহাখালী বাজার
কী বদলেছে
এখনো কোনো সংশোধন প্রকাশ হয়নি।
প্রশ্নোত্তর
এখনো কেউ প্রশ্ন করেননি। প্রথম প্রশ্নটি আপনার হোক।
মিল আছে এমন ব্যবসা
স্ক্রিন প্রিন্ট ও টি-শার্ট
কাপড়ে নকশা ছাপার কাজ। পুঁজি কম, কিন্তু প্রতিটি নকশা ও প্রতিটি রঙের আলাদা স্ক্রিন লাগে — তাই অর্ডার ছোট হলে প্রতি পিসের খরচ অনেক বেড়ে যায়।
- পুঁজি
- ৳৫০ হাজার – ৳৪ লাখ
- জনবল
- ১ – ৬ জন
- প্রথম আয়
- ১৫ – ৪৫ দিন
তাঁত ও জামদানি
কাঠের তাঁতে হাতে বোনা শাড়ি। শাড়ি বিক্রি হয় ৳১,৫০০ থেকে ৳৩ লাখে, অথচ একজন তাঁতির মাসিক আয় প্রায় ৳৪,৫৯০ — লাভ থাকে মহাজনের হাতে।
- পুঁজি
- ৳৬০ হাজার – ৳৪ লাখ
- জনবল
- ২ – ১০ জন
- প্রথম আয়
- ৭ – ১৮০ দিন
দর্জি ও ছোট গার্মেন্টস ইউনিট
প্যান্ট সেলাই ৳৬০০, কারিগর পান ৳২২০, খরচ ৳৯০ — দোকানের থাকে ৳২৯০। একজন কারিগর দিনে ৫টা প্যান্ট বা ১০টা শার্ট করেন। বড় টাকা সাব-কন্ট্রাক্টে, আর সেখানকার নিয়ম এখন কড়া।
- পুঁজি
- ৳৬০ হাজার – ৳৮ লাখ
- জনবল
- ১ – ৩০ জন
- প্রথম আয়
- ১৫ – ৪৫ দিন
মৃৎশিল্প ও টেরাকোটা
মাটির হাঁড়ি-পাতিল, টব ও টেরাকোটার শোপিস তৈরি। বিজয়পুরের পণ্য বিদেশে যায়, কিন্তু গ্যাস না থাকায় লাকড়িতে পোড়াতে হয় আর মাল নষ্ট হয়।
- পুঁজি
- ৳৪০ হাজার – ৳৪ লাখ
- জনবল
- ২ – ১২ জন
- প্রথম আয়
- ৩০ – ৯০ দিন
